মমতাজ উদ্দিন আহমদ :
আলীকদম নামকরণ নিয়ে বহুধা বিভক্ত মতামতের সন্ধান পাওয়া যায়। নামকরণ প্রসঙ্গে সম সাময়িক ইতিহাসে যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে তা থেকে বর্তমান নামকরণে বিস্তর তফাৎ লক্ষ্য করা যায়। এখানকার সমাজ-সংস্কৃতির পুরানো দলিল দস্তাবেজেও আলীকদম নামকরণ নিয়ে তথ্য পাওয়া যায়। তবে নামকরণ প্রসঙ্গে স্থানীয়ভাবে অনেক মতামত পাওয়া গেছে। নিন্মে তা বিধৃত করা হলঃ
‘আলোহক্যডং’ থেকে আলীকদম নামের উৎপত্তি। যার অর্থ পাহাড় ও নদীর মধ্যবর্তী স্থান। এ নামের সঙ্গে পার্বত্য এলাকার অনেক পাহাড়ের নামকরণের সাদৃশ্য আছে। যেমন: কেউক্রাডং, মেরাংডং, পেরাইডং, তাজিংডং প্রভৃতি। জানা গেছে, বোমাং সার্কেলের বোমাং চীপের নথিপত্রে ও ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার কর্তৃক আঁকা মানচিত্রে এই ‘আলোহক্যডং’ নামের সত্যতা পাওয়া যায়। জনৈক ব্রিটিশ সাহিত্যিক ক্যাপ্টেন টি, এইচ, লুইন এর মতে, ALLEY KINGDOM থেকে ALIKADAM হয়েছে। তিনি তাতে ব্যাখ্যা দেন যে, ALLEY অর্থ দমন KINGDOM অর্থ রাজ্য। কথিত আছে যে, মোগল আমলের সুবেদারই বাংলার সম্রাট শায়েস্তা খাঁ সাধারণ এবং ক্ষুদ্র একটি রাজ্য শক্তিকে (রাজনৈতিক সুরেশ্বরী রাজ্য কে) করায়ত্ব বা দমন করেন। তাই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে এ অঞ্চলের নাম হয় ALLEYKINGDOM বা দমন করা রাজ্য।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান তাঁর এক অনুসন্ধানী নিবন্ধে আলীকদম নিয়ে অনেক অজানা তথ্য হাজির করেছেন। তিনি তাঁর নিবন্ধে ‘আলীর পাহাড়’ নিয়ে কৌতিহলোদ্দীপক কতিপয় প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। আলীকদম উপজেলা সদর এলাকা থেকে পূর্ব দক্ষিণ দিকে তাকালে যে পাহাড়টি দেখা যায় সেটির নাম ‘আলীর পাহাড়’। এ নাম থেকে মুসলিম ঐতিহ্যমন্ডিত সভ্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রত্যন্ত এ দুর্গম অঞ্চলে কি করে আলীর পাহাড় নামকরণ হলো তা এক অর্থে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। কালের পরিক্রমায় এ নামটি অবিকৃত থাকলোই বা কি করে? আলীর পাহাড়ের সাথে সঙ্গতিশীল নাম হলো ‘আলীকদম’। যদিও মঘী উচ্চারণে এটির বিকৃত রূপ ‘আলোহক্যডং’ হয়েছে।
আরকানী ভাষায় অনেক পাহাড় ও জায়গার নামে ডং, থং বা দং উপসর্গটি জুড়ে আছে বলে গবেষক আতিকুর রহমান তাঁর লিখিত গবেষণায় মত প্রকাশ করেছেন। সম্ভবত: ডং মানেই পাহাড়। তাই আলীর পাহাড়ই মঘী ভাষায় আলেহ ডং। তা থেকে আলেহ কেডং বা খেদং বিকৃতি।
পার্বত্য অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন মানচিত্র (Ensea Det Bengalla); যা পর্তুগীজ পন্ডিত জোয়াও জে বারোজ (Jao De Barros) কর্তৃক ১৫৫০ সালে অঙ্কিত, তাতে এতদাঞ্চলকে ‘লোভাস ডোকাম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তা আলীকদম-’রই পর্তুগীজ ভাষ্য; আলেহক্যডং এর নয়। আলীকদম এর মঘী উচ্চারণ ‘আলেহ ক্যডং’ হয়ে যাওয়া সম্ভব। মঘী ভাষায় এর অর্থ করা কষ্ট কল্পনা মাত্র। আলীর পাহাড় আর আলীকদম উভয় নামই শব্দগত দিক দিয়ে মুসলিম ঐতিহ্য মন্ডিত।
আলীকদম নামকরণ নিয়ে কৌতুহলের অন্ত নেই। এ নামকরণ নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত যোগাড় করাও বর্তমানে দুষ্কর। সম্ভবত: আলী নামের কেউ এই অঞ্চলে এক সময় আধিপত্য বিস্তার করেছিল। যার ফলশ্র“তিতে আলী নামের সাথে ‘কদম’ শব্দটি যোগ হয়ে ‘আলীকদম’ হয়েছে। আরবীতে ‘কদম’ অর্থ পা, যাকে পদচারণাও বলা যায়। সুতরাং বলা যায়, আলী নামের কেউ সভ্যতার সূচনালগ্নে এখানে সর্বপ্রথম পদচারণা করেছিলেন।
আরকানী ইতিহাস সুত্রে জানা যায়, ১৮ জন আরকানী রাজা শাসন কার্যের সুবিধার্থে মুসলিম উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে ১৪৩৪-১৪৫৯ খ্রীষ্টাব্দে শাসন কার্য পরিচালনাকারী রাজা মাং খারি’র মুসলিম উপধি ছিল ‘‘আলী খান” এবং ১৫৩১ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ রাজত্ব পরিচালনাকারী রাজা থাজাথা’র মুসলিম উপাধি ছিল আলী শাহ্। এ থেকে বলা যেতে পারে এ রাজাদ্বয়ের আলাদা কোন প্রভাব এ এলাকায় পড়েছিল। যার প্রেক্ষিতে ‘‘আলীকদম’’ নামের সৃষ্টি হতে পারে।
মতান্তর রয়েছে যে, ৩৬০ আওলিয়া উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। এঁদের একটি সংখ্যা হয়ত বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইসলামের জয় নিশান উড়িয়েছিলেন। এঁদেরই মধ্যে হয়ত ‘আলী” নামের কোন সাধক পার্বত্য এতদাঞ্চল আসেন। যার পদধুলিতে ধন্য হয়ে এ এলাকার নাম ‘‘আলীকদম” হয়েছে।
জনশ্র“তি আছে, ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (র.) রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে সারা পৃথিবী পরিভ্রমণ করেছেন। তাঁর এতাদাঞ্চল সফর করার ফলশ্র“তিতে ‘আলীকদম’ নামকরণ হতে পারে। তবে এ দাবী ইসলামের ইতিহাস মতে সমর্থন যোগ্য নয়। কারণ ইসলামের সূচনা পর্বে হযরত মুহাম্মদ (স.) ’র একজন মাত্র সাহাবীই উপমাহাদেশে এসেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস নামের একজন সাহাবী চীন হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসেন আবার চীনেই তিনি চলে যান বলে বর্ণিত আছে। তাঁর সমাধিও চীনে রয়েছে বলে জানা যায়। সুতরাং আলীকদম নামকরণ প্রশ্নে পূর্বোক্ত জনশ্র“তির সত্যতাকে মেনে নেয়া যায় না। তবে আলীকদম নামটি নানা রূপকথা ও অর্ধসত্য কাহিনীতে ভরপুর। এর সত্যতা উদ্ধারের প্রচেষ্টাও ক্ষীণ। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আসল তথ্য হয়ত কোনদিনই জানতে পারবে না।